বর্তমান বিশ্বে আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে ইন্টারনেট নামক অদৃশ্য জালে জড়িয়ে আছি। এই অদৃশ্য জালে জড়ানোর জন্য আমাদের জীবনটা পূর্ব পুরুষদের থেকে সহজ হয়ে গেছে।এই অদৃশ্য জাল ১৯৬৯ সালে আবিষ্কার হয়।  এই ইন্টারনেট নামক অদৃশ্য জাল  শুধু ইউটিউব, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বোঝায় না। সমগ্র পৃথিবীর মানুষ এই জালকে ব্যাক্তিগত ও অফিসিয়াল গোপন তথ্য  সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করার কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলেছে। আমাদের বিভিন্ন ধরনের সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণের জন্য ইন্টারনেটকে একটি নিরাপদ মাধ্যম মনে করি।



কিন্তু  এত নিরাপত্তার মধ্যে দিয়েও কিছু কম্পিউটার জিনিয়াসের কাছে তথ্য গুলো হস্তক্ষেপ করা একটি সহজ কাজ।এই জিনিয়াস ব্যাক্তিদের আমরা হ্যাকারস্,ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারস, হোয়াট হ্যাট হ্যাকারস, ক্র্যাকারস্, সাইবার ক্রিমিনাল, সাইবার পাইরেটস ইত্যাদি নামে জানি।তারা নিজেদের  তৈরি ক্ষতিকারক সফটওয়্যার ও ভাইরাস ব্যাবহার করে অন্যের তথ্য হস্তক্ষেপ করতে পারে। তাছাড়াও তারা অন্যের কম্পিউটার, মোবাইল, ওয়েব সাইটসহ যে কোন সিস্টেম অকেজো করে দিতে পারে বা নিজের আয়ত্তে নিতে পারে খুব সহজে। চলুন জেনে নিই এমন দশ জন সেরা হ্যাকার সম্পর্কে।

 
 

১|গ্যারি ম্যাকিনন

গ্যারি ম্যাকিনন ছোটবেলা থেকে খুব দূরন্ত প্রকৃতির ছিলেন।তিনি ছোটবেলা থেকে ইউএফও  (UFO) সম্পর্কে জানার জন্য অনেক আগ্রহী ছিলেন।তাই গ্যারি ম্যাকিনন চিন্তা করেছিলেন তিনি যদি  সরাসরি নাসার ওয়েব সাইটে ঢুকতে পারেন তাহলে ইউএফও (UFO) সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানতে পারবেন।ইউএফও (UFO) সম্পর্কে জানার প্রবল আগ্রহের কারনে নাসার ওয়েব সাইটের সকল সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে গ্যারি ম্যাকিনন আমেরিকান আর্মড ফোর্স ও নাসার ৯৭ টি কম্পিউটার হ্যাক করেন এই জিনিয়াস হ্যাকার। তিনি কম্পিউটারে ভাইরাস ইনস্টলের মাধ্যমে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ডিলিট করে দেন। গ্যারি ম্যাকিনন বেআইনিভাবে ওয়েব সাইটে প্রবেশ করে তথ্য ডিলিট করেন এবং ওয়েবসাইট গুলোর নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের উদ্দেশ্যে একটি মেসেজ লিখে রাখেন।মেসেজটি হলো "ইউর সিকিউরিটি ইজ ক্র্যাপ "। এটা ছিল ওয়েবসাইট  গুলোর নিরাপত্তার দ্বায়িত্ব থাকা ব্যাক্তিদের জন্য খুবই লজ্জাজনক। তিনি এটা করেছিলেন শুধুমাত্র তার ইউএফও সম্পর্কে জানার কৌতূহল থেকে।গ্যারি ম্যাকিনন তার লন্ডনের এর বান্ধবীর আন্টির বাড়ি থেকে হ্যাকিং এর সম্পূর্ণ কাজ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি ২৪ ঘন্টার জন্য ওয়াশিংটন নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ২০০০ টি ইউ এস মিলিটারির কম্পিউটার অকেজো করে দিয়েছিলেন। এটা ছিল ইতিহাসের সেরা মিলিটারি কম্পিউটার হ্যাকিং এর ঘটনা। 




২|লুলজসিক

একটি প্রচন্ড শক্তিশালী ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার গ্রুপ হলো লুলজসিক বা লুলজ সিকিউরিটি। এরা পৃথিবীর বড় বড় কোম্পানির ওয়েব সাইট হ্যাক করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো সনি, নিউজ ইন্টারন্যাশনাল, সিআইএ,এফবিআই, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো কোম্পানি। তারা বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা নিউজ প্রচার করত বিভিন্ন নিউজ কর্পোরেশনের একাউন্ট হ্যাক করে। তাদের অবসরে যাওয়ার সংবাদ প্রচারের জন্য তারা দ্যা টাইমস্, দ্যা সান এর মতো জনপ্রিয় পত্রিকার ওয়েবসাইট হ্যাক করে। তবে অনেকে মনে করেন এই দলটি অন্য হ্যাকারদের বিরুদ্ধে  জনগণকে সাবধান হয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহনের  সচেতনতা তৈরি করত।



৩|আদ্রিয়ান লামো

আদ্রিয়ান লামো ছিলেন একজন অসম্ভব প্রতিভাবান হ্যাকার। তিনি সর্ব্বোচ্চ নিরাপত্তাযুক্ত   গুগল, মাইক্রোসফট, ইয়াহুর মতো ওয়েবসাইট হ্যাক করেছিলেন। তার এই হ্যাকিং তাকে শিরোনামে নিয়ে আসে। আদ্রিয়ান লামোর হ্যাকিং পদ্ধতি ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি হ্যাকিং এর জন্য ব্যবহার করতেন পাবলিক ইন্টারনেট।এজন্য সকলে তাকে "হোমলেস হ্যাকার" নামে উপাধি দেওয়া হয়। হ্যাকিং এর জন্য তাকে ২০০৪ সালে গ্রেফতার করে। এছাড়াও তাকে জরিমানা দিতে হয় ৬৫ হাজার ডলার। 




৪|ম্যাথু বেভান ও রিচার্ড প্রাইস 

তারা ছিল একে অপরের হ্যাকিং এর সহযোগী। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আমিরিকা ও উত্তর কোরিয়ার সংবেদনশীল তথ্য হস্তক্ষেপ করা। ইউএস মিলিটারির কম্পিউটার হ্যাক করে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে।তারা আমেরিকার পরিচয় গোপন করে এই কাজ গুলো করে দক্ষিণ কোরিয়ার উপর দায় চাপিয়ে দিত। কারণ  উত্তর কোরিয়ার আর দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক ভালো ছিল না। এক সময় এটা আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিনত হয়।



৫|জোনাথন জেমস

জোনাথন জেমস ছিলেন একজন তরুণ প্রতিভাবান হ্যাকার। তাকে ১৬ বছর বয়সে সাইবার ক্রাইম অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছিল। জোনাথন জেমস তার এই নামের থেকে "কমরেড" নামে অধিক পরিচিত। জোনাথন জেমস ইউএস ডিপার্টমেন্টের ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি হ্যাক করে তাদের তথ্য হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি এমন একটি সিস্টেম ইনস্টল করেছিলেন

এজেন্সিতে । কারন এজেন্সিতে কর্মকর্তাদের মধ্যে  যে মেসেজ আদান প্রদান করবে তা যেন তিনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন। তিনি  বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার চুরি করেন। তাছাড়াও তিনি নাসার ওয়েব সাইট হ্যাক করে ৪১ হাজার ডলার চুরি করেন। তিনি ২০০৮ সালে আত্নহত্যা করেছিলেন। 



৬|কেভিন পলসেন

আপনি অথবা আমি পছন্দের গাড়ি বা বাড়ি করার স্বপ্ন থাকলে কি করব অবশ্যই দিন রাত এক করে পরিশ্রম করব। তাছাড়াও মনে করেন কোন লটারি বা অনলাইনে কোন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে কি করবেন আপনি? অবশ্যই নিজের ভাগ্যের উপন নির্ভর করে বসে থাকবেন। কিন্ত এগুলো আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষ ভাগ্যের উপর নির্ভর করবে। এক্ষেত্রে  যদি কেভিন পলসেন হয় তবে অন্য কথা। কেভিন পলসেন সাইবার জগতে "ডার্ক দান্তে " নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি একটি রেডিও  চ্যানেল হ্যাক করেন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার জন্য।  লস এঞ্জেলের একটি রেডিও চ্যানেলে প্রতিযোগিতাটি ছিল এমন যে ১০২ নম্বর কলারকে একটি দামি গাড়ি গিফট করা হবে। কেভিন পলসেন গাড়িটি পাওয়ার জন্য রেডিও চ্যানেল হ্যাক করে টেলিফোন লাইন জ্যাম করে দিয়ে ১০২ নম্বর কলার তিনি নিজে হয়ে পুরুষ্কার গ্রহণ করেন। কিন্ত এফ বি আই এর হতে বন্দী হন পরবর্তীতে। 


৭|কেভিন মিটনিক 

কেভিন মিটনিক ছিলেন এক সময়ের কুখ্যাত সাইবার অপরাধী। তিনি বিভিন্ন বড় বড়  টেলেকম কোম্পানির ডাটাবেইজ হ্যাক করে বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি আমিরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি হ্যাক করতে চেয়েছিলেন।এর জন্য তাকে বেশ কিছু সময় কারাবন্দী হয়ে থাকতে হয়েছিল। এর মধ্যে আট মাস ছিলেন নির্জন কারাবন্দী। এখানে থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করেন। সাইবার জগতের দক্ষতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তিনি এখন একটি কোম্পানির সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করছেন। 




৮|অ্যানোনিমাস

অ্যানোনিমাস হলো একটি ছদ্মবেশী হ্যাকার গ্রুপ। এই হ্যাকার গ্রুপ তাদের ভক্তদের কাছে " ডিজিটাল রবিনহুড " নামে পরিচিত। এরা মুখোশধারী মানুষ নামেও পরিচিত।  এরা হ্যাকিং করার সময় পরিচয় গোপন রাখে। এরা তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বিভিন্ন সরকারি, ধর্মীয় ও কর্পোরেট ওয়েবসাইট গুলো হ্যাক করে। অ্যানোনিমাস হ্যাকিং গ্রুপের হ্যাকিং এর মূল লক্ষ্য হলো পেপাল,ভিসা মাস্টার কার্ড,সনি,এফবিআই, সিআইএ ইত্যাদি। ভ্যাটিকান,চীন,উগান্ডা, ইসরায়েল তিউনিসিয়া দেশ গুলোর ওয়েবসাইট এদের লক্ষ্যবস্তু।




৯|অ্যাস্ট্রা

অ্যাস্ট্রা হলো একজন ৫৮ বছর বয়সী হ্যাকারের ছদ্মনাম। হ্যাকরের পাশাপাশি তিনি একজন গণিতবিদ। অ্যাস্ট্রা হলো সংস্কৃত শব্দ। তিনি তার পরিচয়ে এই নামটি ব্যবহার করতেন। তিনি ফ্রান্সের ডাসল্ট গ্রুপের ওয়েবসাইট হ্যাক করতেন অস্ত্রের ডিজাইন হস্তক্ষেপ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে বিক্রি করতেন। পাঁচ বছরে তিনি ২৫০ জন মানুষের কাছে অস্ত্রের ডিজাইন বিক্রি করেন। এর ফলে ডসল্ট গ্রুপের ৩৬০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।


১০|আলবার্ট গাঞ্জলেজ

আলবার্ট গাঞ্জলেজ হলেন এমন একজন হ্যাকার যিনি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড হ্যাক করে ইন্টারনেট ব্যাংকিংকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিলেন।  ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড হ্যাক করা ছিল তার কাছে শখের মত। জানলে অবাক হবেন তিনি মাত্র দুই বছরে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করেন। এটা ইতিহাসের সর্বোচ্চ ক্রেডিট কার্ড চুরি ঘটনা।  এটা ক্রেডিট কার্ডের কোম্পানির জন্য লজ্জাজনক বিষয়। আলবার্ট গাঞ্জলেজ ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করে ১০০ কোটি ডলার পকেটে ঢুকিয়েছিলেন। কিন্তু দূভাগ্যবশত তিনি পুলিশের হতে ধরা পড়েন। এর জন্য তাকে ২০  বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। 



এই রকম হাজারো হ্যাকার আছে যাদের হ্যাকিং এর দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে হ্যাকিং করেছেন এবং ভবিষ্যতে করবেন। যত দিন ইন্টারনেট নামক এই জালটি থাকবে নতুন নতুন এক্সপার্ট হ্যাকার জন্ম নিবে।